শ্রমবাজারে চাহিদা ও দেশগুলোয় অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার কারণে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে অভিবাসী কর্মীদের ভূমিকা বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। মাঝে কভিড-মহামারী কর্মীদের অভিবাসনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও তা অনেকটা পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। এতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে আরব অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো। খবর দ্য ন্যাশনাল।
প্রতিবেদন বলছে, অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে আরব দেশগুলোয় কর্মসংস্থান ও জনসংখ্যা অনুপাত ২০১৯ সালের ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এর প্রধান কারণ হলো, কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে দেশগুলোর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি। উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি তেলবহির্ভূত খাতের সম্প্রসারণ ক্রমে বাড়ছে। বিশেষত নির্মাণ ও আতিথেয়তা খাতের সম্প্রসারণ বিদেশী কর্মীর চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে।
আইএলওর দেয়া তথ্য অনুসারে, সাম্প্রতিক বছরে আরব দেশগুলো বৈশ্বিক শ্রমশক্তিতে অভিবাসী কর্মী নিয়োগে সর্বোচ্চ সক্ষমতা দেখিয়েছে। ২০২২ সালে সেখানে অভিবাসী পুরুষ ছিল মোট পুরুষ শ্রমশক্তির ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অভিবাসী নারীরা মোট নারী শ্রমশক্তির ৩১ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ অনুপাত সবচেয়ে কম ছিল। এখানে অভিবাসীরা পুরুষ কর্মীর ১ দশমিক ৩ দশমিক ও নারীরা ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক অভিবাসী কর্মী ১৬ কোটি ৭৭ লাখে পৌঁছে, যা ২০১৩ সালের তুলনায় তিন কোটিরও বেশি। ২০২২ সালে অভিবাসী শ্রমিকদের বেশির ভাগই ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় অবস্থান করছিল। ৫ কোটি ৭৮ লাখ অভিবাসী কর্মী নিয়ে অঞ্চল দুটির হিস্যা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ছিল আমেরিকায় ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ (৪ কোটি ৫৮ লাখ), এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ (২ কোটি ৭২ লাখ), আরব রাষ্ট্রে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ (২ কোটি ২৬ লাখ) এবং আফ্রিকায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ (১ কোটি ৪৩ লাখ)।
জাতিসংঘের এ সংস্থা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অভিবাসীরা বর্তমানে বৈশ্বিক শ্রমশক্তির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে, যা বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে তাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।
২০২২ সালে শ্রমশক্তিতে আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের বণ্টন দেখায় যে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ বা বেশির ভাগই উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপে বাস করত, যা দেশগুলোর শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সময়ে উত্তর আমেরিকায় অভিবাসন পরিস্থিতিতে কিছুটা পতন দেখা যায়। মূলত নীতি পরিবর্তনের কারণে শ্রমশক্তিতে অভিবাসীদের অনুপাত ২০২২ সালে ২২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০১৩ সালে ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
আইএলও আরো জানিয়েছে, ২০২২ সালে মোট আন্তর্জাতিক অভিবাসী ছিল ২৮ কোটি ৪৫ লাখ। এর মধ্যে ২৫ কোটি ৫৭ লাখ কর্মজীবী বয়সের, অর্থাৎ ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, যদিও সবাই সক্রিয় ছিল না।
অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে ২০২২ সালে ১৫ কোটি ৫৬ লাখ বিভিন্ন খাতে কর্মরত ছিল এবং ১ কোটি ২১ লাখ বেকার ছিল। এটি ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেকারত্বের হার নির্দেশ করে, যা অভিবাসী নয় এমন ব্যক্তিদের ৫ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় বেশি। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, বিদেশে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার স্বীকৃতি না থাকা এবং বৈষম্যসহ বিভিন্ন কারণে বেকারত্বে এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
আইএলওর চতুর্থ সংস্করণের এ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৭ এবং ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অভিবাসী শ্রমশক্তির বার্ষিক গড় বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এ বৃদ্ধি কমে বার্ষিক ১ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। এর কারণ হিসেবে কভিড-১৯ মহামারীসহ অন্যান্য প্রভাবক উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মসংস্থানে লিঙ্গবৈষম্যের চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, অভিবাসী শ্রমশক্তিতে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি। অভিবাসী শ্রমশক্তির ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ বা ১০ কোটি ২৭ লাখ ছিল পুরুষ এবং ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৬ কোটি ৪৯ লাখ নারী। এছাড়া পুরুষ অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ ছিল ৯ শতাংশ, যা নারীদের ৫২ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। নারীদের কর্মসংস্থান কম হওয়ার কারণ হিসেবে সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব, সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ ও সীমিত চাকরির সুযোগকে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএলওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসী শ্রমিকরা গন্তব্য দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও অভিবাসন প্রক্রিয়া আরো জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ছে না।
প্রতিবেদনটি বলেছে, অভিবাসী শ্রমিকরা উন্নত কর্মসংস্থান ও উচ্চ মজুরির সন্ধানে স্থানান্তরিত হন। এ অর্থনৈতিক লক্ষ্য অভিবাসীদের বৈশ্বিক শ্রমশক্তিতে উচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। তবে বিভিন্ন কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং বৈষম্য অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই উৎস ও গন্তব্য উভয় দেশের জন্য অভিবাসন নীতি আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।